May 20, 2026, 4:25 am

করোনার জরুরি প্রকল্পে সাড়ে চারশো কোটি টাকা লোপাট!

করোনার জরুরি প্রকল্পে সাড়ে চারশো কোটি টাকা লোপাট!

তন্ময় ইসলাম: করোনার ভয়াবহ সময়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে জরুরি চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী করতে নেওয়া হয়েছিল হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল দেশের হাসপাতালগুলোতে দ্রুত আইসিইউ, পিআইসিইউ, অক্সিজেন ব্যবস্থা, আরটি-পিসিআর ল্যাব ও জরুরি স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু সেই প্রকল্পেই এখন উঠে এসেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক শৃঙ্খলাভঙ্গের বিস্ময়কর চিত্র। সরকারি অডিট ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় আইসিইউ সামগ্রী সরবরাহ না করেই সাড়ে ১৩ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পুরো প্রকল্পে ৪৬৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা অনিয়মের মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে।

“কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (২য় সংশোধিত)” নামের এই প্রকল্পের অডিট করেছে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর (এফএপিঅএডি)। অন্যদিকে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। দুটি প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মহামারির মতো সংকটকালেও প্রকল্পটিতে ক্রয় অনিয়ম, ভুয়া সরবরাহ, অযোগ্য ঠিকাদার নিয়োগ, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি গ্রহণ, অতিরিক্ত দামে ক্রয় এবং বিল জালিয়াতির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে বড় অনিয়ম আইসিইউ সরঞ্জামে

অডিট প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুতর আপত্তি হিসেবে উঠে এসেছে- চুক্তি অনুযায়ী আইসিইউ চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ ছাড়াই ১৩ কোটি ৫১ লাখ ৩৮ হাজার ৫১৮ টাকা বিল পরিশোধের ঘটনা। এফএপিঅএডি এটিকে “অনিয়মিত অর্থপ্রদান” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সরবরাহের কথা ছিল, তার পূর্ণ সরবরাহ নিশ্চিত না করেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল ছাড় করা হয়। অর্থাৎ বাস্তবে যন্ত্রপাতি পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও কাগজে-কলমে গ্রহণ দেখিয়ে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। করোনার সময় যখন আইসিইউ বেডের অভাবে বহু রোগী জীবন হারিয়েছেন, তখন এমন অনিয়মকে অডিট কর্মকর্তারা গুরুতর জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।

  • অনিয়মের মাধ্যমে ৪৬৪ কোটি টাকা লুটপাট
  • আইসিইউর বড় অংশ অচল; বিশ্বব্যাংকের অর্থও ফেরত
  • আইসিইউ সামগ্রী সরবরাহ না করেই সাড়ে ১৩ কোটি টাকা বিল
  • পণ্য না দিয়েই কোটি কোটি টাকা পরিশোধের তথ্য অডিটে
  • ডেমারেজেই গচ্চা ১০ কোটি টাকার বেশি

একই ধরনের আরেকটি অনিয়মে দেখা গেছে, কারিগরি স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সরঞ্জাম সরবরাহ না পেলেও আরও ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহ না পেয়েও ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অডিটে বলা হয়েছে, এসব অর্থ ছাড়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ এবং পিপিআর-২০০৮-এর একাধিক ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, চুক্তির শর্ত পূরণ না করেও ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের কারণে সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

৪৬৪ কোটি টাকার অডিট আপত্তি

এফএপিঅএডি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রকল্পটিতে মোট ৭৬টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এসব আপত্তিতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ৪৬৪ কোটি ৮৫ লাখ ৪১ হাজার ৫৪১ টাকা।

এর মধ্যে মাত্র ৭৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকার আটটি আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ৩৮৫ কোটি ৫০ লাখ ৮৯ হাজার টাকার ৬৮টি আপত্তি এখনো অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মোট ৭৬টি আপত্তির মধ্যে ৪৬টি আপত্তির জন্য সরাসরি দায়ী করোনা প্রকল্প অফিস। এসব আপত্তিতে জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪৬১ কোটি টাকা। বিপরীতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ৩০টি আপত্তিতে জড়িত অর্থের পরিমাণ মাত্র ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

উচ্চমূল্যে যন্ত্রপাতি, অযোগ্য সরবরাহকারী

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিপিপিতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। বাজারদরের তুলনায় উচ্চমূল্যে সরঞ্জাম ক্রয়, অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি গ্রহণ এবং সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কিছু ক্ষেত্রে ক্রয়কৃত চিকিৎসা সামগ্রীর মান যাচাই ছাড়াই নিম্নমানের পণ্য গ্রহণ করা হয়েছে। আবার সিএমএসডির প্রতিবেদনে অনেক যন্ত্রপাতিকে ব্যবহার অনুপযোগী ও ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিটে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে মালামাল সরবরাহ না করলেও ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিলম্ব জরিমানা (এলডি) আদায় করা হয়নি। কোথাও আয়কর ও ভ্যাট কর্তন করা হয়নি, আবার কোথাও কর্তন করেও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।

ডেমারেজেই গচ্চা ১০ কোটি টাকা

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম খালাসে নয় মাসের বেশি বিলম্ব হওয়ায় সরকারকে ১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকার বেশি ডেমারেজ চার্জ গুনতে হয়েছে। অডিট কর্মকর্তারা এটিকে সম্পূর্ণ অনিয়মিত ব্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এছাড়া ওমিক্রন ও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্তকরণ কিটের পরিবর্তে আরটি-পিসিআর কিট গ্রহণ করে ৫৮ লাখ টাকার অর্থ পরিশোধের ঘটনাও ধরা পড়ে। অডিটে বলা হয়েছে, এটি চুক্তির শর্ত এবং পিসিসি কাজ লঙ্ঘন করে করা হয়েছে।

আইসিইউ ও পিআইসিইউ বাস্তবায়ন শূন্য

প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ ও পিআইসিইউ ইউনিট স্থাপন। কিন্তু মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পরিকল্পনার বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি।

১৪টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পিআইসিইউ এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট ও শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পৃথক ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। মোট ১৬টি পিআইসিইউ ইউনিট স্থাপনের লক্ষ্য থাকলেও একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবায়নের হার ছিল শূন্য।

একইভাবে ৫০টি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও অধিকাংশ হাসপাতালে কার্যকর সেবা চালু হয়নি। কোথাও অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি। ফলে কক্ষ, পাইপলাইন ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও আইসিইউ বা পিআইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বহু হাসপাতালে তৈরি করা অবকাঠামো বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে। কোথাও যন্ত্রপাতি নেই, কোথাও জনবল নেই, আবার কোথাও অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজের কারণে ইউনিট চালু করা যায়নি।

কেন পিছিয়ে গেল প্রকল্প

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যন্ত্রপাতি সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল প্রকল্প অফিসের আর ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের। কিন্তু পূর্তকাজ শুরুতেই অস্বাভাবিক ধীরগতি দেখা দেয়। ফলে আইসিইউ ও পিআইসিইউ স্থাপনের পুরো কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ে।

ডলার সংকট, এলসি জটিলতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকট, কন্ট্রাসা অ্যাকাউন্ট খোলার জটিলতা এবং এআইআইবির বিল প্রসেসিংয়ে বিলম্বের কারণেও প্রকল্পের কাজ দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।

ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৩০৪টি ক্রয় প্যাকেজের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের একটি অংশ ফেরতও চলে যায়।

দুর্নীতির অভিযোগেই ধীর হয় প্রকল্প

প্রকল্পের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বিজনেস নিউজকে বলেন, শুরুতেই প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় প্রকল্পের গতি কমে যায়। কিছু অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকিগুলোর জবাব দেওয়া হয়েছে।

তবে অডিট ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রকল্পটির বড় সমস্যা ছিল দুর্বল পরিকল্পনা, সমন্বয়হীনতা এবং নজরদারির অভাব। জরুরি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দ্রুত ক্রয়ের নামে নিয়ম লঙ্ঘন, যাচাই-বাছাই ছাড়া বিল পরিশোধ এবং অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের হাতে কাজ দেওয়ার ফলে প্রকল্পটি বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ে।

এমএস

Please Share This Post in Your Social Media


Leave a Reply

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com